নিঃশব্দের নক্ষত্র মনোরঞ্জন নন্দী

                          মনোরঞ্জন নন্দী

সারা জীবন নিজেকে 'মূর্খ-সুর্খ মানুষ' বলে হালকা করে দেখিয়েছেন, অথচ বিরল বিনয়ের শক্তিতে তিনি ছিলেন রাজশাহীর সাহিত্য-সংস্কৃতির আকাশে এক অবিচ্ছিন্ন আলোকস্তম্ভ। শিক্ষার মূল্য সনদে মাপা যায় না, বরং মাপা যায় ভালোবাসায়, কৌতূহলে, আর মানুষের প্রতি গভীর দায়বদ্ধতায়। মনোরঞ্জন নন্দী, আমাদের সবার নন্দীদা, ছিলেন এই সত্যের জীবন্ত প্রমাণ।

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার গণ্ডি তিনি উচ্চমাধ্যমিকের পর আর পেরোতে পারেননি, কিন্তু তাঁর অদম্য সাধনা তাঁকে এনে দিয়েছিল প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক ও কবি অনিক মাহমুদের মতো মানুষের সান্নিধ্য। নন্দীদা নিজেও এ নিয়ে গর্ব করতেন, আর সেটি ছিল তাঁর স্বভাবসুলভ বিনয়ের ভেতর একেবারেই ন্যায্য গর্ব।

শৈশব থেকেই তাঁর জীবনের সংগ্রামের শুরু। পারিবারিক আর্থিক সংকট তাঁকে ঠেলে দিয়েছিল স্কুলের গণ্ডির বাইরে। তবু তিনি থামেননি। হাতে পাওয়া যে কোনো ছাপা কাগজ মন দিয়ে পড়তেন। এই অদম্য পাঠপিপাসাই তাঁকে গড়ে তুলেছিল জ্ঞানের ভাণ্ডার হিসেবে। ছোটবেলায় সঙ্গের প্রভাবে জীবন খানিকটা বাঁক নিয়েছিল। জীবিকা টিকিয়ে রাখতে তাঁকে নানা ছোটখাটো কাজেও জড়াতে হয়েছিল। যেসব কাজ সমাজ পাশ কাটিয়ে দেখে, সেসবই ছিল তাঁর বাস্তবতা। আর সেই বাস্তবতাকেই তিনি শক্তিতে পরিণত করেছিলেন শুদ্ধ হৃদয়ের জোরে।

আশির দশকের শেষে আমি যখন ভোলানাথ বিশ্বেশ্বর হিন্দু একাডেমির ছাত্র, তখন থেকেই নন্দীদাকে দেখতাম। বোয়ালিয়া থানার দক্ষিণে আমাদের দোতলা ভাড়া বাড়ির জানালা দিয়ে প্রতিদিন তাঁর টলোমলো হাঁটা চোখে পড়ত। স্নায়ুরোগের কারণে তাঁর হাঁটায় থাকত টলোমলো ভাব। প্রায় একই মোটা চেক শার্ট, কর্মদিবসে প্যান্ট আর ছুটির দিনে পরিপাটি করে পরা লুঙ্গি, দূর থেকেও তাঁকে চিনে ফেলা যেত। তখনো আমাদের পরিচয় হয়নি। খেলতে খেলতে তাঁর বাড়িতে অসংখ্যবার ঢুকে পড়েছি, তবু আমরা ছিলাম অচেনা।

    নন্দীদা, বৌদি, বৌমা

ঘনিষ্ঠ পরিচয় ঘটে ২০০৩ সালে, যখন আমি নিয়মিত বসতাম মেট্রোপলিটন প্রেসক্লাবে। নন্দীদা প্রতিদিন সেখানে যেতেন, মনোযোগ দিয়ে সব পত্রিকা পড়তেন, সাংবাদিকদের সঙ্গে আলোচনায় যোগ দিতেন। তিনি ছিলেন বিনয়ের এক জীবন্ত উদাহরণ। তাঁর কথাবার্তায় ছিল অসম্ভব আনুষ্ঠানিকতা, কিন্তু সেই আনুষ্ঠানিকতা সবসময়েই প্রবল আন্তরিকতার কারণে অদৃশ্য হয়ে যেত। পত্রিকা চাইতে গেলেও বলতেন, “দাদা, কিছু মনে করবেন না, আপনার সামনে যে পেপারটা আছে, সেটা আমাকে এগিয়ে দেবেন?” - এই সরলতাই ছিল তাঁর মহত্ত্বের পরিচায়ক।

নিজেকে সবসময় ক্ষুদ্র করে রেখেছেন, অথচ বাস্তবে তিনি উঠে গিয়েছিলেন সবার উপরে। প্রতি কথায়ই নন্দীদা বলে উঠতেন, “দাদা, আমি তো মূর্খ-সুর্খ মানুষ।” তাঁর সেই বিনয়ী স্বীকারোক্তি আমাদের নিজেদের ক্ষুদ্রতা টের পাইয়ে দিত।

বইয়ের প্রতি নন্দীদার ভালোবাসা এত গভীর ছিল যে সামর্থ্যের বাইরে নিজের ঘরে গড়ে তুলেছিলেন এক ছোট্ট লাইব্রেরি। হাতে পাওয়া যে কোনো বই তিনি পড়তেন মন দিয়ে, আর সেই পড়ার শক্তিই তাঁকে টেনে নিয়েছিল লেখালেখির জগতে। স্থানীয় পত্রিকায় তিনি নিয়মিত কলাম লিখতেন। সমাজের অন্যায়, অসঙ্গতি, সমকালীন রাজনীতি আর মুক্তিযুদ্ধ ছিল তাঁর লেখার মূল সুর।

বেতারের মঞ্চেও পৌঁছে গিয়েছিল তাঁর কলম। লিখেছেন চল্লিশটিরও বেশি নাটক, যার অনেকগুলো প্রচারিত হয়েছে ঢাকা, খুলনাসহ দেশের নানা বেতার কেন্দ্র থেকে। দেড় দশকেরও বেশি সময় তিনি ছিলেন বাংলাদেশ বেতারের প্রথম শ্রেণির নাট্যকার।

শিশু-কিশোর সাহিত্যেও তাঁর অবদান অনন্য। ২০০৫ সালে প্রকাশিত 'সবুজ দ্বীপের ইতিকথা' তাঁকে নতুন পাঠকের কাছে পরিচিত করে তোলে। দুই বছর পর আসে উপন্যাস 'ভালোলাগা ভালবাসা', আর ২০১০ সালে প্রকাশিত 'মামার গল্প' তাঁকে শিশুদের হৃদয়ের কাছাকাছি পৌঁছে দেয়। সেই বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে সাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক বলেছিলেন, “একটি বইয়ের প্রকাশ অনেকটা সন্তানের জন্মের মতো। শিক্ষাঙ্গন যখন অস্থিরতায় কাঁপছে, নন্দীর এই প্রয়াস এই সময়ে অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।”

মনোরঞ্জন নন্দী তিন দশকের বেশি সময় রাজশাহীতে ভারতীয় হাইকমিশনে চাকরি করেছেন। কিন্তু পেশার চেয়ে অনেক বড় ছিল সমাজ ও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধ একজন লেখক ও সংস্কৃতিসেবীর পরিচয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি শহরের কুমারপাড়া এলাকায় অবস্থানরত একটি গেরিলা বাহিনীর সদস্য হিসেবে কাজ করেছেন। সে সময়কার অভিজ্ঞতার গল্প তিনিই আমাকে শুনিয়েছিলেন।

আমাদের তিনজনের - নন্দীদা, আমি এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেপুটি রেজিস্ট্রার শফিকুল ইসলাম ভাইয়ের, আড্ডা জমত বোয়ালিয়া থানামোড়ে কিংবা অ্যাডভোকেট হাবিবুর রহমানের চেম্বারে। আমাদের আড্ডায় মাঝেমধ্যেই যোগ দিতেন সমাজের মান্যগণ্য অনেকে। ব্যক্তিগত জীবনেও তিনি ছিলেন আবেগপ্রবণ। বড় ছেলের বিয়েতে আমাদের নিয়ে গিয়েছিলেন সিরাজগঞ্জে। আনন্দের কারণ ছিল তাঁর বৌমা, এই বৌমাই তাঁর টলোমলো সংসারকে দৃঢ় হাতে আবার দাঁড় করিয়ে রেখেছিল, এখনো রেখেছে।

রাজনীতি নিয়ে ছিল তাঁর সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর তিনি বলেছিলেন, “দাদা, আওয়ামী লীগ কী দেখেননি তো, দেখবেন। আমি অতীতে যা দেখেছি, যদি আবার তা ঘটে, তবে দেশে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটবে।” সময় প্রমাণ করেছে, তাঁর সেই আশঙ্কা একেবারে অমূলক ছিল না।

     নন্দীদা, বৌদি, বৌমা ও আমি

মনোরঞ্জন নন্দী ১৯৫৮ সালে নাটোরে জন্মগ্রহণ করেন, তবে কর্মসূত্রে শৈশব থেকে রাজশাহীতেই ছিলেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি থেকেছেন বা থাকতে চেয়েছেন সমাজ ও মানুষের পাশে। সংসারের বাস্তবতা অনেক সময় তাঁকে ভেঙে দিয়েছে, কখনো বিভ্রান্তও করেছে, কিন্তু তিনি নিজের লড়াই থামাননি। তিনি রেখে গেছেন স্ত্রী বিথীকা নন্দী, দুই পুত্র বিভাস নন্দী মিঠু ও পরাগ নন্দী এবং অসংখ্য গুণগ্রাহী।

মিঠু ও পরাগ আমাকে জানিয়েছে, শেষবার অসুস্থ হলে নন্দীদা আগের মত হাসপাতালে যেতে আগ্রহী হননি। চিকিৎসককে বাসায় নিয়ে গিয়ে দেখাতে হয়েছিল। নন্দীদা ওদের বলেছিলেন, 'আর থাকবোনা পৃথিবীতে, এবার চলে যাবো।'

নন্দীদা চলে গেছেন নিঃশব্দে, কিন্তু তাঁর বিনয়ের আলো, তাঁর জ্ঞানের তৃষ্ণা আর মানুষের প্রতি তাঁর নিঃস্বার্থ ভালোবাসা আমাদের পথকে আলোকিত করে যাবে অনেক দূর পর্যন্ত। তিনি প্রমাণ করে গেছেন, বড় হতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি নয়, লাগে অদম্য ইচ্ছাশক্তি, জ্ঞানের প্রতি ভালোবাসা আর মানুষের প্রতি নিঃস্বার্থ মমতা।

Comments

Popular posts from this blog

Smugglers-BDR Affair on Barendra Express

Jessore GOC, pilot killed in chopper crash

Will Altadighi come back to life?